মহাকাশে অদৃশ্য মাইনফিল্ড
ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরের ভূ-সমলয় কক্ষপথ এখন মহাকাশ বর্জ্যে ঠাসা
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ২২:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাতের বিস্তীর্ণ আকাশে আমরা কেবল তারার মিটিমিটি আলোই দেখি। এই নৈসর্গিক প্রশান্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে মানুষেরই তৈরি এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছাড়িয়ে মহাশূন্যের যে অংশটিতে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান ও ব্যয়বহুল স্যাটেলাইটগুলো ঘুরছে, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক ‘অদৃশ্য মাইনফিল্ড’ বা মরণফাঁদে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক-এর একদল গবেষকের করা একটি নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার (২২ হাজার মাইল) ওপরের ‘জিওস্টেশনারি অরবিট’ বা ভূ-সমলয় কক্ষপথ এখন ছোট ছোট মহাকাশ বর্জ্যে ঠাসা। মাত্র ২ ইঞ্চি বা ৫ সেন্টিমিটার আকারের এসব ভাসমান টুকরো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও, এগুলোই হতে পারে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্যাটেলাইটগুলোর অকালমৃত্যুর কারণ।
জিওস্টেশনারি কক্ষপথ মহাকাশের কোনো সাধারণ জায়গা নয়; এটি কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলোর জন্য এক প্রকার ‘ভিআইপি জোন’। পৃথিবীর আবর্তন গতির সঙ্গে ঠিক তাল মিলিয়ে এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো ঘোরে। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হয় এগুলো আকাশের একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থির হয়ে আছে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে টেলিভিশন সম্প্রচার, বিশ্বব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট পরিষেবা, আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং সামরিক নজরদারি চালানোর জন্য গত কয়েক দশক ধরে এই কক্ষপথের ওপরই ভরসা করে আসছে বিশ্ব। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই পরম নির্ভরতার স্থানটিতে আমাদের স্যাটেলাইটগুলো আদৌ কতটা নিরাপদ?
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য এবং এসজেই স্পেস-এর মহাকাশ পরামর্শক স্টুয়ার্ট ইভস পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা বোঝাতে একে একটি ‘মাইনফিল্ড’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যথাযথ মাইন-ডিটেক্টর ছাড়া যেমন কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ মাইনফিল্ডে পা রাখে না, ঠিক তেমনি বর্জ্য জরিপ ছাড়া জিওস্টেশনারি কক্ষপথে নতুন করে স্যাটেলাইট পাঠানোও এখন বোকামির শামিল।’
এই ক্ষুদ্র অথচ প্রাণঘাতী বর্জ্যগুলো দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ২.৫৪ মিটারের আইজ্যাক নিউটন টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া পুরোনো ডেটাসেট নতুন করে বিশ্লেষণ করে এই চিত্র ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা ‘ব্লাইন্ড স্ট্যাকিং’ নামক একটি অত্যাধুনিক ইমেজ প্রসেসিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করেন।
ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর স্পেস ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস-এর রিসার্চ ফেলো বেন কুক জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবির বহু ফ্রেমকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে অস্পষ্ট ও দ্রুতগামী বস্তুকে শনাক্ত করা যায়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ২৫টি নতুন বর্জ্যের গতিপথ শনাক্ত করেছেন, যার ৮০ শতাংশই আগে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই উচ্চতায় বর্জ্যের আচরণ। ‘লো-আর্থ অরবিট’ বা পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা বর্জ্যগুলো বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে একসময় ধীর হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে বায়ুমণ্ডলের কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে সেখানে ঘর্ষণের কোনো সুযোগ নেই। একবার যে বর্জ্য সেখানে পৌঁছায়, তা অনন্তকাল ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে।
মহাকাশে এই বস্তুর গতিবেগ থাকে সেকেন্ডে কয়েক কিলোমিটার। এই প্রচণ্ড গতির কারণে একটি মাত্র ৫ সেন্টিমিটারের স্ক্রু বা ধাতব টুকরো বুলেটের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিতে আঘাত হানতে পারে। জিওস্টেশনারি কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো আকারে বেশ বড় হয়। অনেক স্যাটেলাইটের সোলার প্যানেল ১০০ ফুট (৩০ মিটার) বা তারও বেশি চওড়া হয়ে থাকে। বর্জ্যের একটি ছোট্ট আঘাত এই বিশাল কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে তাকে চিরতরে অকেজো করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে ‘কেসলার সিনড্রোম’ শুরু হতে পারে; যেখানে একটি সংঘর্ষ থেকে সৃষ্টি হবে হাজারো নতুন টুকরো, যা আবার চেইন রিঅ্যাকশনের মতো নতুন নতুন সংঘর্ষের জন্ম দেবে।
গবেষক জেমস ব্লেকের মতে, ‘এই ছোট জিনিসগুলোই আসলে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। মহাকাশে এগুলোর গতিশক্তি এত বেশি যে, ছোট একটি টুকরোই একটি অতিমূল্যবান স্যাটেলাইটকে ধ্বংস করে বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’
বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বের অন্যান্য টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই বর্জ্যদূষণের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন। মহাকাশ গবেষণায় আমরা যতই এগোচ্ছি, আমাদের দায়িত্বহীনতার ছাপ ততই স্পষ্ট হচ্ছে মহাশূন্যে। এখনই এই বর্জ্য পরিষ্কারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ না করলে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের মাথার ওপরের এই মহামূল্যবান কক্ষপথটি মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য এক মৃতপুরীতে পরিণত হবে।
তথ্যসূত্র: স্পেস ডট কম
- বিষয় :
- মহাকাশ
- শাহেরীন আরাফাত