ঢাকা রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস

যে হাত বাঁচায় তার সুরক্ষা কে দেবে?

যে হাত বাঁচায় তার সুরক্ষা কে দেবে?
×

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৮ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ২২:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস’। এ দিনটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা উদযাপনের দিন নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, সেবা এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো অকুতোভয় কর্মীদের স্মরণ করার দিন। ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ভয়াবহ বোমা হামলায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার সের্গিও ভিয়েরা দ্য মেলোসহ ২২ জন মানবিক কর্মী প্রাণ হারান। সেই মর্মান্তিক স্মৃতিকে স্মরণ করে ২০০৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে ‘বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০২৬ সালে এসে এ দিবসটি উদযাপনের ১৮তম বছরে বিশ্ববাসী এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে–যেখানে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু সংকট এবং আর্থিক অনুদানের ঘাটতি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ বছরের বিশ্ব মানবতাবাদী দিবসের বৈশ্বিক প্রচারণার মূল সুর হলো–বৈশ্বিক সংহতি এবং মানবতার রক্ষকদের সুরক্ষা।

জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ বিশ্লেষণে এবার জোর দেওয়া হয়েছে একটি স্পষ্ট বার্তার ওপর–‘মানবিক কাজে নিয়োজিত কর্মীরা কখনও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন না।’

আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ বা দুর্যোগকবলিত এলাকায় নিয়োজিত মানবিক কাজে নিয়োজিত কর্মীদের সুরক্ষা পাওয়া মৌলিক অধিকার। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গাজা, সুদান, ইউক্রেনসহ বিশ্বজুড়ে মানবিক কাজে নিয়োজিতরা হামলা, অপহরণ ও প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন। যে আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বেড়েছে। ২০২৪-২৫ সালে বৈশ্বিকভাবে ৩৮০ জনেরও বেশি মানবিক কাজে নিয়োজিত কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন; যা ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘ দৃঢ়ভাবে দাবি তুলছে মানবতার পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটিতে পৌঁছেছে। প্রয়োজন ও জোগানের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিলের চাহিদার বিপরীতে অনুদান মিলছে অর্ধেকেরও কম; যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় কর্মসূচিতে।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জন্য মানবিক কার্যক্রম কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি নিত্যদিনের বাস্তবতা। ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব মানচিত্রে এক অনন্য মানবিক গবেষণাগার হিসেবে পরিচিত।

চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ভুক্তভোগী হিসেবে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যেভাবে বুক পানিতে নেমে মানুষকে উদ্ধার করেন, তা বৈশ্বিক মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ওপর এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক অনুদান কমে আসায় খাদ্য ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ যেভাবে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হলেও এখন টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সংহতির জোর দাবি উঠছে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে মানবিক সহায়তায় স্থানীয় সংস্থা ও তরুণদের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি’র মতো হাজার হাজার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং দেশীয় এনজিওগুলো আন্তর্জাতিক বার্তা পৌঁছানোর আগেই উদ্ধার কাজে নেমে পড়ে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গড়ে ওঠা এ স্বেচ্ছাসেবী মানসিকতাই দেশের আসল মানবিক শক্তি।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো– ১. তহবিলের স্থানীয়করণ: আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিলের সিংহভাগ সরাসরি দেশীয় বা স্থানীয় সংস্থাগুলোর হাতে পৌঁছায় না। এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা জরুরি। ২. নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ: স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক কর্মীদের জীবন বীমা, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার সহায়তা এবং আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা আজও একটি বড় অভাব। ৩. জলবায়ু সংকট: জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী না হয়েও বাংলাদেশকে বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে। তাই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

বিশ্ব মানবতাবাদী দিবস ২০২৬ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সহানুভূতি কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; তার জন্য প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। দুর্যোগ ও সংকটের মুখে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন বাঁচান, তাদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে সীমিত সম্পদে অসীম আত্মত্যাগ ও স্থানীয় সংহতির মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকার দেশগুলোর পাশে আরও জোরালোভাবে দাঁড়ানোর এবং বৈশ্বিকভাবে মানবিক কর্মীদের নিরাপত্তাকে আইনি ও কার্যকর সুদৃঢ় ভিত্তি দেওয়ার। যখন মানবিকতার রক্ষকরা নিরাপদ থাকেন, তখনই কেবল সুরক্ষিত থাকতে পারে মানবজাতি, সুরক্ষিত থাকে আমাদের পুরো পৃথিবী।

আরও পড়ুন

×