ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টনির রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা

নদীর কান্না শুনতে পায়ে হেঁটে ৬৩০ কিলোমিটার

টনির রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা
×

 আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যাপের রেখা ধরে আমরা অনেকেই পথ চিনি, কিন্তু এমন পথের খোঁজ কি কেউ রাখে, যা গুগল ম্যাপেও স্পষ্ট নয়? যেখানে পিচঢালা রাজপথ শেষ হয়ে মিশে গেছে পলি মাটির চরে, আর দিগন্তজোড়া নদীর বুকে জেগে আছে অনিশ্চয়তা? সেই অনিশ্চিত ও রোমাঞ্চকর পথেই পা বাড়িয়েছিলেন মাসফিকুল হাসান টনি। লক্ষ্য ছিল একটাই–নদীর কান্না শোনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতা নিজের চোখে দেখা।

উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলার চর কুকরি-মুকরি। মাঝখানে ১৮ দিনের দীর্ঘ পথ, ৬২৫ কিলোমিটারের ক্লান্তিহীন পদযাত্রা এবং ছয়টি বিভাগের ১২টি জেলা ছুঁয়ে যাওয়ার গল্প। টনির এই যাত্রা কেবল একজন পরিব্রাজকের ভ্রমণ নয়, বরং এটি নদী ও মানুষের জীবন এক সুতোয় গাঁথার এক অনন্য দলিল।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ডিগ্রির চর থেকে শুরু হয় এই অভিযান। টনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য শুধু নদীর ধারে হাঁটা ছিল না, চেয়েছিলাম নদীঘেঁষা জনপদের মানুষের টিকে থাকার লড়াইটা দেখতে।’

অদৃশ্য পথের সন্ধানে
১৮ দিনের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রুট প্ল্যান বা পথের নকশা করা। কারণ নদীর পার ধরে আদৌ হাঁটার মতো কোনো পথ আছে কিনা, তা ছিল অজানা। গুগল ম্যাপ বারবার বিকল্প রাস্তা দেখালেও বাস্তবে সেখানে হয়তো ছিল ধু-ধু বালুচর অথবা ভাঙনকবলিত পার। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা আর নিজের পর্যবেক্ষণ শক্তিই ছিল টনির একমাত্র কম্পাস।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অতিক্রম করেছেন কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুরের অংশবিশেষ, শরীয়তপুর, বরিশাল ও ভোলা জেলা। যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার মতো প্রমত্তা নদীগুলোর তীর ধরে হাঁটতে গিয়ে দেখেছেন প্রকৃতির বিচিত্র রূপ।

শুকিয়ে যাওয়া নদী আর মানুষ
নদীর তীর ধরে হাঁটতে গিয়ে টনি দেখেছেন করুণ দৃশ্য। অসংখ্য চ্যানেলে এখন আর পানি নেই; সেখানে চাষ হচ্ছে সরিষা, বাদাম ও শাকসবজি। আবার কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও বা উত্তাল নদী। ১৫টির বেশি খাল ও ছোট নদী পার হতে হয়েছে তাঁকে।
প্রকৃতির রুদ্ররূপের বিপরীতে তিনি পেয়েছেন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। অজপাড়াগাঁয়ের মাঝিরা তাঁকে অতিথি হিসেবে সম্মান জানিয়ে বিনা ভাড়ায় নদী পার করে দিয়েছেন। কৃষকের ঘরের আমন চালের ভাত কিংবা জেলের জালে ধরা টাটকা রিটা ও পোয়া মাছের ঝোলের স্বাদ টনির কাছে পাঁচতারকা হোটেলের চেয়েও দামি মনে হয়েছে। এই নিঃস্বার্থ আতিথেয়তাই ছিল অভিযানের অন্যতম শক্তি। 

আতঙ্ক আর ‘ভূতের ডাকবাংলো’
রোমাঞ্চকর এই যাত্রায় বিপদও কম ছিল না। শরীয়তপুরের মাঝিরকান্দি এলাকায় তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি তাঁকে ধাওয়া করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দৌড়ে একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়ে এবং স্থানীয় শিক্ষকদের সহায়তায় রক্ষা পান তিনি।
সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয় শরীয়তপুরের সখীপুরে। ভুল বোঝাবুঝির কারণে তিনি গিয়ে পৌঁছান এক পরিত্যক্ত ‘ভূতের ডাকবাংলোয়’। টনি বলেন, ‘আমি শরীয়তপুরের ইউএনও-কে ফোন না করে ভুল করে টাঙ্গাইলের ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে ডাকবাংলোর কথা নিশ্চিত করেন। কিন্তু আমি তো তখন শরীয়তপুরে! রাতে গিয়ে দেখি এক ভূতুড়ে পরিবেশ। শেষমেশ স্থানীয় এক যুবকের সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয় মেলে।’

তা ছাড়া নদীপারে ক্যামেরা বা ফোন হাতে দেখলেই অনেকে তাঁকে ‘সরকারি লোক’ বা ‘সাংবাদিক’ ভেবে সন্দেহ করতেন। বিশেষ করে জাটকা ইলিশ নিধনের মৌসুমে ভিডিও করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এই ভীতিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির সংকট ও অনিয়মের চিত্র।
মাসফিকুল হাসান টনির ৬৩০ কিলোমিটারের এই পদযাত্রা বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পরিব্রাজন ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। তিনি শুধু পথ হাঁটেননি, তিনি হেঁটেছেন মানুষের হৃদয়ের ভেতর দিয়ে। তাঁর এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। সেই নদীর কান্না শোনার জন্য মাঝে মাঝে পিচঢালা পথ ছেড়ে নামতে হয় মাটির পথে। v
 

আরও পড়ুন

×