বহুভাষী হওয়ার নেপথ্যের বিজ্ঞান ও শিল্প
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন একটি ভাষা শেখার চেষ্টা করেছেন, অথচ মাঝপথে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেননি–এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বছরের পর বছর ব্যাকরণের মোটা বই মুখস্থ করে, হাজারো নিয়মকানুন আত্মস্থ করার পরও একটি বিদেশি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলার স্বপ্ন অনেকের কাছেই অধরা থেকে যায়। মনে হয়, এ যেন এক দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড় ডিঙানোর বৃথা চেষ্টা! অথচ আমাদের আশপাশেই এমন কিছু বিস্ময়কর মানুষ আছেন, যারা অনায়াসেই একের পর এক নতুন ভাষা শিখে ফেলছেন। কেউ হয়তো প্রতি দুই-তিন বছরে একটি নতুন ভাষা আয়ত্ত করছেন, কেউ বা অনর্গল কথা বলছেন দশ-বারোটি ভাষায়। ভাষার সীমানা অনায়াসে পার হওয়া এ মানুষদের বলা হয় ‘পলিগ্লট’ বা বহুভাষী। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে–এই বহুভাষীদের জাদুকরী ক্ষমতার রহস্য কী? তাদের মস্তিষ্কের গঠন কি আমাদের চেয়ে আলাদা? নাকি তাদের হাতে রয়েছে কোনো গোপন চাবিকাঠি?
পদ্ধতির বিস্ময়কর বৈচিত্র্য
বহুভাষীরা কীভাবে ভাষা শেখেন, তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তাদের নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। প্রত্যেকের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক ক্ষেত্রে রীতিমতো অভিনব।
আয়ারল্যান্ডের তরুণ বেনি লুইসের ভাষা শেখার পদ্ধতি হলো ‘প্রথম দিন থেকেই কথা বলা’। তিনি ব্যাকরণের ধার ধারেন না। একটি ট্রাভেল বুক থেকে দৈনন্দিন ব্যবহারের কয়েকটি সাধারণ বাক্য শিখে নিয়েই তিনি সোজা মাতৃভাষীদের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করে দেন। দিনে হয়তো তিনি ২০০টি ভুল করেন, কিন্তু সেই ভুল থেকে পাওয়া ফিডব্যাক এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের আনন্দই তাঁর শেখার মূল হাতিয়ার। আবার ব্রাজিলের লুকাসের পদ্ধতিটিও বেশ রোমাঞ্চকর এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। রুশ ভাষা শেখার শুরুতে তিনি স্কাইপে ১০০ জন অপরিচিত রাশিয়ানকে বন্ধু হিসেবে যুক্ত করেন। এরপর একজনকে রাশিয়ান ভাষায় মেসেজ পাঠান– ‘হাই!’ ওপাশ থেকে উত্তর আসে, ‘হাই, কেমন আছ?’ লুকাস সেই বাক্যটি কপি করে আরেকজন রাশিয়ানকে পাঠিয়ে দেন। সেই ব্যক্তি হয়তো উত্তর দেন, ‘আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছ?’ লুকাস সেটি আবার প্রথম জনকে পাঠান। অর্থাৎ লুকাস নিজে ভাষার বিন্দুবিসর্গ না জেনেও, শুধু ‘কপি-পেস্ট’ করে অসংখ্য চ্যাট করতে করতে তিনি নিজেই বুঝে যান, রাশিয়ান ভাষায় কীভাবে কথা শুরু করতে হয়, কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
আনন্দের স্নায়ুবিজ্ঞান
বহুভাষীদের মধ্যে একটি বড় মিল রয়েছে–তারা সবাই ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটিকে প্রচণ্ড উপভোগ করেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান এ বিষয়টিকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে। যখন আমরা কোনো কাজ উপভোগ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে। ডোপামিন শুধু আমাদের আনন্দই দেয় না, এটি আমাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং নতুন তথ্য মস্তিষ্কে গেঁথে নেওয়ার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যেমন ধরুন, স্প্যানিশ শেখার সময় পাঠ্যবইয়ের ‘হোসে কীভাবে স্টেশনে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছে’–এমন প্রাণহীন ও একঘেয়ে গল্প পড়ার চেয়ে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত ‘হ্যারি পটার’ পড়া অনেক বেশি কার্যকর। শুরুতে হয়তো অনেক কিছুই দুর্বোধ্য মনে হবে, কিন্তু গল্পের প্রতি টান ও ভালোবাসার কারণে পাঠক ঠিকই পড়া চালিয়ে যাবেন। মস্তিষ্ক ডোপামিনের প্রভাবে অবচেতনভাবেই শব্দের অর্থ ও বাক্যের কাঠামো ধরতে শুরু করবে।
সাবলীলতার চার স্তম্ভ
শুধু আনন্দ পেলেই ভাষা শেখা সম্পূর্ণ হয় না। আনন্দের পাশাপাশি একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য বিজ্ঞানসম্মত আরও চারটি নীতির প্রয়োগ প্রয়োজন–
১. কার্যকর পদ্ধতির প্রয়োগ ও স্পেসড রিপিটেশন: পরীক্ষার আগের রাতে মুখস্থ করা পড়া আমরা কয়েকদিন পরই ভুলে যাই। কারণ সেটি আমাদের ‘শর্ট টার্ম মেমরি’ বা স্বল্প মেয়াদি স্মৃতিতে জমা হয়। উনিশ শতকের মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিংহাউস তাঁর বিখ্যাত ‘ফরগেটিং কার্ভ’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন শেখা তথ্য ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়া রোধ করার সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো ‘স্পেসড রিপিটেশন’ বা নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে পুনরাবৃত্তি করা।
২. রুটিন বা সিস্টেম তৈরি: আমাদের সবারই সবচেয়ে বড় অজুহাত ‘সময়ের অভাব’। কিন্তু ভাষা শেখার জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠে ১৫ মিনিট শব্দার্থ পড়া, জ্যামে বসে অডিও পডকাস্ট শোনা বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুদিন ২০ মিনিট করে কোনো ভাষাসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলাই যথেষ্ট।
৩. ধৈর্য এবং ছোট ছোট জয়: দুই মাসে কোনো ভাষা পুরোপুরি শেখা অবাস্তব, কিন্তু নিজের লক্ষণীয় উন্নতি দেখা অবশ্যই সম্ভব। ভাষা শেখার দীর্ঘ যাত্রায় এই ছোট জয়গুলো মানুষকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে।
৪. মেধার মিথ ভেঙে ফেলা: অনেকেই ভাবেন, বহুভাষীদের জন্মগত মেধা বা বিশেষ ‘ল্যাঙ্গুয়েজ জিন’ আছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যখনই প্রথাগত একঘেয়ে শিক্ষার শিকল ভেঙে ফেলবেন, তখন হয়তো আপনিও একাধিক ভাষা অনর্গল বলতে পারার ক্ষমতার চেয়ে মাত্র একটি ‘আনন্দদায়ক পদ্ধতি’র দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন! আজই শুরু হোক সেই আনন্দময় যাত্রা।
- বিষয় :
- শাহেরীন আরাফাত
- বহুভাষী
- ভাষা শিক্ষা
- ভাষাবিজ্ঞান
