আম আর শৈশবের স্মৃতি
সঞ্জয় দেবনাথ
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্কুলে যাওয়ার পথে ভীতিকর একটা বাড়ি ছিল। সবাই বলত কাজিবাড়ি। এ বাড়িটির পাশ দিয়ে যেতে ভয়ে গা-ছমছম করত। সদর রাস্তা দিয়ে স্কুলে গেলে অনেক দূরের পথ পার হতে হতো। ভেতর দিয়ে কাজিবাড়ির পাশ দিয়ে গেলে কম সময়ে যাওয়া যেত। আশপাশে প্রচুর লম্বা গাছ থাকায় রোদের সময়েও রাস্তাটা আবছা আলো আবছা ছায়ায় সেজে থাকত। বাউন্ডারির ভেতরে বিশাল জায়গা থাকলেও তেমন কেউ থাকত না। তবে বেশ কিছু ভবন ছিল। মানুষ না থাকার কারণে লোকমুখে নানা কথা ছড়াত।
কেউ বলত এখানে রাতে জিন-পরিদের আসর বসে। আবার এমন লোকও পাওয়া যেত যারা রাতের বেলায় পরিদের নূপুরের শব্দ শুনেছে। কেউ বলে, এখানে অনেক আগে কোনো এক গৃহবধূকে এক ঝড়ের রাতে ভূতপ্রেত মেরে ফেলেছে। ঝড়ের শব্দের কারণে কেউ শুনতে পায়নি। পরের দিন লাশ দেখতে পেয়ে সবাই দেখে গৃহবধূর গলায় দাঁতের দাগ।
কথা লতাপাতার মতো ছড়ায়। আমরা কয়েকজন সহপাঠী এ ভীতিকর বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যেতাম। একা একা খুব একটা যাওয়া হতো না। তখন তো মোবাইলের যুগ ছিল না। আগের দিন বলে রাখতাম কয়টার সময় বের হবো। সেই অনুযায়ী সবাই বের হতাম। কখনও গরমিল হতো না। কী সোনালি যুগ ছিল, হায়!
ভীতিকর রাস্তা আমরা নানা কথায় পার হতাম। কখনও কখনও সবাই একসঙ্গে দ্রুত বেগে যেতাম। একজন আরেকজনকে ভয় দেখানোর জন্যও পার হতাম। এ নিয়ে কত অভিমান করতাম আমরা! আমাদের হিরণ্ময় অভিমানের সে দিনগুলো এ জীবনের সেরা অর্জন ছিল–এখন বুঝি।
বড়জোর সাত-আটজন নিয়মিত যেতাম এ রাস্তা ধরে। তাদের মধ্যে ছিল আলাদা একরকম বন্ধুত্ব। কী নাম দেওয়া যায় এ বন্ধুত্বের? ভয়বিনাশী বন্ধুত্ব? থাক, বন্ধুত্বের তো কোনো নাম হয় না। সেটা যে উপলক্ষেই তৈরি হোক–খুশবু ঠিকই ছড়ায়।
কাজিবাড়ির ভেতর এবং বাইরে বেশ কয়েকটি আম গাছ ছিল। মানুষের আসা-যাওয়া কম থাকায় প্রায়ই গাছের নিচে আম পাওয়া যেত। কালবৈশাখীর সময় আমের হাট বসত। কত আম খেয়েছি ইয়ত্তা নেই। খুবই মিষ্টি ছিল এখানকার আম। স্কুল ছুটি হওয়ার পর ফিরতি পথে আমের মৌসুমে প্রায়ই আম কুড়াতাম। ঢাউস আকারের আমগুলো দেখতেও লোভনীয় ছিল।
স্কুলের দিন পার করে আমরা অনেকটা সময় সবাই পার করে এসেছি। সবাই রুটি-রুজি জোগাতে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। চাইলেই বাজারের ব্যাগভর্তি আম কিনে এনে খাওয়া যায়। কিন্তু শৈশবের সে আমের স্বাদ পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে না। কারণ আমাদের দিনগুলো ‘সোনার খাঁচায়’ রইলো না। কারও দিনই রয় না। আমরা সময়ের পরিক্রমায় কেবলই এগিয়ে যাই আর স্মৃতির মূল্যবান নুড়ি রেখে যাই।
ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম
- বিষয় :
- স্মৃতি
- জীবনের গল্প
- শৈশব
- সঞ্জয় দেবনাথ