ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উন্নয়ন অবকাঠামোর নিচে দীর্ঘশ্বাস

উন্নয়ন অবকাঠামোর নিচে দীর্ঘশ্বাস
×

অভিযোগ রয়েছে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের জন্য মেগা প্রকল্পে দুর্ঘটনা ঘটছে। ইনসেটে নিহত আবুল কালামের স্ত্রী আইরিন আক্তার ও ছেলে আবদুল্লাহ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহরজুড়ে উন্নয়নের উল্লাস! তার নিচে চাপা পড়ে আছে নাগরিকের নীরব ভয়। ঢাকা আজ মেগা প্রকল্পের নগরী–মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার; যা একদিকে যেমন অগ্রগতির প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি এক অনিরাপদ বাস্তবতার করুণ প্রতিচ্ছবি। এই উন্নয়নের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে যেন স্বজনের আহাজারি আর বিপদের হাতছানি। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
------------------------------------------------------------------------------

২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর, রোববার। নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী থেকে প্রতিদিনের মতো ঢাকায় এসেছিলেন আবুল কালাম (৩৫)। ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন তিনি। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার এই যুবক, যিনি কিশোর বয়সেই বাবা-মাকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর ছোট সংসারটির একমাত্র অবলম্বন। দুটি ফুটফুটে সন্তান–আবদুল্লাহ (৫) ও পারিসাকে (৩) নিয়ে সংসার সাজিয়েছেন। পৃথিবীর সব বাবার কাছে যেমন, আবুল কালামের কাছেও তারা ছিল রাজপুত্র-রাজকন্যা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে তাঁর মাথার ওপর। মুহূর্তেই সব শেষ। এক লহমায় একটি হাসিখুশি জীবন, একটি সাজানো সংসার আর দুটি অবুঝ শিশুর ভবিষ্যৎ গুঁড়িয়ে গেল।

স্বামীর মৃতদেহের পাশে বসে শোকে কাতর সদ্য বিধবা আইরিন আক্তার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এটি সাধারণ কোনো মৃত্যু নয়। এটি হত্যার চেয়েও বেশি। এখানে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা স্পষ্ট।’ তিনি বিচার চান, কিন্তু প্রশ্ন হলো–আইরিন আক্তার কি আদৌ বিচার পাবেন? তাঁর এই আর্তনাদ কি শুধুই একজন হারানো স্বজনের শোক, নাকি এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক জোরালো অভিযোগ?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বহুগুণ খরচে তৈরি এই মেট্রোরেল প্রকল্প। জাপানের মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। তবুও কেন নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হলো? কেন ২০২০ সালে বুয়েটের ল্যাব পরীক্ষায় ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হওয়ার পরও সেই বিয়ারিং প্যাডগুলোই ব্যবহার করা হলো? যাদের রক্ত-ঘামের টাকায় এই উন্নয়ন, তাদেরই কেন মরতে হলো এই ‘অপ-উন্নয়নের’ নিচে চাপা পড়ে?

দুই.
এই মৃত্যু কোনো দৈব ঘটনা নয়, এটি ছিল পুনরাবৃত্ত ব্যর্থতা। এর আগেও একবার ফার্মগেটের কাছাকাছি একই ধরনের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল, যদিও তখন কেউ হতাহত হননি। সেই ঘটনা তদন্তের পরও কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। 

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট এলাকাতে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তখন রেল চলাচল বন্ধ ছিল প্রায় ১১ ঘণ্টা। সে সময় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়–মেট্রোরেলের পুরো পথে থাকা বিয়ারিংগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ড্রোন দিয়ে ছবি তুলে নথিভুক্ত করে রাখতে হবে। আর অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য বিয়ারিং আটকে রাখতে ইস্পাতের কাঠামো জুড়ে দিতে হবে। এ জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অপেক্ষা করতে হয় মানুষের মৃত্যুর। আবুল কালাম নিহত হওয়ার পর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল পথে ৬২০ পিলারে ইস্পাতের রক্ষাকবচ বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। 

এদিকে, বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য গা শিউরে ওঠার মতো। তারা বিয়ারিং প্যাড দেখে বলেছেন, এগুলো এখনও সেই পরিমাণে ক্ষয় হয়নি, যেমনটা হলে কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে। এটি কোনো সাধারণ ক্ষয়জনিত সমস্যা নয়। নকশা বা নির্মাণে গুরুতর ত্রুটি না থাকলে বিয়ারিং প্যাড এভাবে নিচে পড়ে যেত না।

বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালট্যান্টের পরিচালক ড. সামছুল হক বলেন, ‘বিয়ারিং প্যাডের মান খারাপ হলে কাঠামোগত ত্রুটি দেখা দেবে। এর প্রভাবে চলাচলের সময় ঝাঁকুনি অনুভূত হতে পারে। এমনকি এটি পিলারের ফাউন্ডেশনেরও ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এটি ব্যবহারের দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’

তিন.
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি বিকেলে কর্মস্থল থেকে অফিসের বাসে রওনা দিয়ে শান্তিনগরে নামেন খুলনার মেয়ে দীপান্বিতা বিশ্বাস। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সদরঘাট শাখায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাস থেকে নেমে হেঁটে মগবাজারের বাসায় ফিরছিলেন। ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্টের পাশে মৌচাক উড়াল সড়কের নিচ দিয়ে হেঁটে আসার সময় ওপর থেকে ইট পড়ে তাঁর মাথায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেছেন তাঁর স্বামী প্রকৌশলী তরুণ কুমার বিশ্বাস। ইটটা কোথা থেকে এসেছে, তা এখনও পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি। 

২০২২ সালের ১৫ আগস্ট (সোমবার) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে উত্তরা জসীমউদ্দীন এলাকার আড়ংয়ের সামনে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের গার্ডার ভেঙে পড়ে একটি প্রাইভেটকারে। গাড়িতে থাকা পরিবারটি একটি বৌভাতের অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিল। এক পলকে তাদের জীবন বদলে গেল আজীবনের জন্য। দুই শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন– রুবেল (৫০), ঝরনা (২৮), জান্নাত (৬) জাকারিয়া (২) ও ফাহিমা। আহত হৃদয় ও রিয়া মনি প্রাণে বেঁচে যান। 

ব্যস্ত সড়কে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না দিয়ে ভারী গার্ডার তোলা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারে ক্রেন কিংবা আহতদের নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সও থাকার কথা, যা ছিল না। এটি ভয়ানক অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার নজির।

বাংলাদেশে নির্মাণকাজের কারণে মৃত্যুর ঘটনা বিরল নয়। ২০২২ সালের ২৯ মে সকালে পল্লবীতে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলার সময় ইট পড়ে এক পথচারী নিহত ও পাঁচজন আহত হন। নিহত মাহবুবুর রহমান তালুকদার (৪৯) মিরপুর-১০ নম্বরের একটি জুয়েলারি দোকানের শ্রমিক এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে তেজগাঁও এলাকায় ক্রেন ভেঙে কনটেইনার পড়ে এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন।

২০১২ সালে চট্টগ্রাম নগরীর নির্মাণাধীন বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে ১৭ জন প্রাণ হারান। এর আগে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছে নির্মাণাধীন ফুট ওভারব্রিজের বিম ধসে প্রাণ হারান অনেকে।

কয়েক বছর ধরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি প্রকল্প কিংবা ফুট ওভারব্রিজ তৈরির সময় গার্ডার বা নির্মাণসামগ্রী পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বারবার ঘটলেও এটি বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

চার.
অসংখ্য মানুষের স্বপ্নে ভরা নগরীতে মেট্রোরেল দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের প্রতীকে। এই প্রতীক ডুবে আছে বিদেশি ঋণে। জাইকার অর্থায়নে দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-৬।
প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ খরচ দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। ইতোমধ্যে আরও দুটি লাইন নির্মাণের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।

ডিএমটিসিএলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ব্যয়ের দিক থেকে এশিয়ায় সব দেশকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্প। ভারতে এক কিলোমিটার মেট্রোরেলের নির্মাণ খরচ ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার, রিয়াদে ১৬৬ মিলিয়ন ডলার, দুবাইয়ে ১৮৮ মিলিয়ন ডলার। আর ঢাকায় প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২৬.৭৪ থেকে ২৫৩.৬৩ মিলিয়ন ডলার।

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দ্রুত বাস চলাচলের জন্য নেওয়া ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প ধীরগতির কাজেরও নজির তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের প্রকল্পে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ চলছে। গত জুলাই পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে দুই হাজার ২২৫ কোটি টাকা।

প্রশ্ন ওঠে, কেন এত টাকা খরচ করে জাপানের নামকরা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নিয়ে তৈরি হওয়া মেগা প্রকল্পের যন্ত্রাংশ নিম্নমানের হবে? কেন ২০২০ সালে বুয়েটের ল্যাব পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ার পরও সেই ত্রুটিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাডই ব্যবহার করা হলো?

অবহেলা-অব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতায় একের পর এক লাশ পড়েছে; প্রতিরোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এই বৃহৎ প্রকল্পের এক সরবরাহকারী ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ সব প্রকল্পেই থাকে। তবে কাজ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন স্তরে অপ্রদর্শিত অর্থ দিতে হয় ঠিকাদারদের। যে কারণে উপকরণের মান ১৯-২০ করতে হতে পারে। আবার নির্মাণকালীন নিরাপত্তাও ঠিক রাখা কঠিন হয় লোকবল ও লজিস্টিকস সীমাবদ্ধতার কারণে। এসবের সঙ্গেও অবৈধ লেনদেন যুক্ত রয়েছে বলে ওই ঠিকাদারের দাবি।

উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এক নিরীহ পথচারীর মৃত্যু যদি রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া না দেয়, তবে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবলই মরীচিকা। ঢাকার মেগা প্রকল্প আর আকাশচুম্বী অবকাঠামোর নিচে চাপা পড়ে থাকা নাগরিকদের নীরব ভয় দূর করার জন্য কর্তৃপক্ষের শুধু অনুশোচনা নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর জবাবদিহি। কোনো পরিবারকে যেন এভাবে অপ-উন্নয়নের বলি হতে না হয়–এটিই আজকের ঢাকার সবচেয়ে বড় মানবিক প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন

×