ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভাগ্য বদল

স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভাগ্য বদল
×

কারখানায় স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করছেন কুড়িগ্রামের প্রান্তিক নারীরা

সুজন মোহন্ত

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৯ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের জোতগোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা পারভীন খুশি। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোতেই বাল্যবিয়ে নামের সামাজিক ব্যাধিতে থমকে গিয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। তবুও তিনি হার মানেননি। কেবল ব্যবসায়ী স্বামীর সংসার সামলানোর পাশাপাশি অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। বিএসএস পড়ার সময় স্বামীর সংসারে সচ্ছলতা আনতে যোগ দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি সংস্থায় স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে। ২০১৯ সালে প্রজেক্ট শেষ হতেই কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। এ ছন্দপতনই যেন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, হয়ে ওঠেন একজন সফল উদ্যোক্তা এবং শত নারীর অনুপ্রেরণা।

খাদিজা পারভীন খুশি ২০২০ সালে নিজের জমানো ৫০ হাজার টাকা এবং এলাকার ২০ জন বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও অসচ্ছল নারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকার নেন। মোট দেড় লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলেন ‘কল্যাণী নারী কল্যাণ সমবায় সমিতি’। ইউএনসিডিএফের ‘স্বপ্ন’ প্রজেক্টের আওতায় ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির এক সাহসী যাত্রা।

প্রান্তিক নারীর কর্মসংস্থান ও কারখানার কর্মযজ্ঞ শহরের ত্রিমোহনী পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় গড়ে ওঠা ‘কল্যাণী স্যানিটারি ন্যাপকিন কারখানা’য় বর্তমানে কাজ করছেন ১২৪ জন নারী। সরেজমিনে কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে চলছে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ। কেউ মেডিসিন কটন দিয়ে রোল তৈরি করছেন, কেউ রোলে নেট পেঁচিয়ে প্যাড বানাচ্ছেন, আবার কেউ অটোক্লেভ মেশিনে জীবাণুমুক্ত করছেন সেই প্যাডগুলো। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এখানে গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়ের বদলে ব্যবহার করা হয় মেডিসিন কটন ও সুতি কাপড়। কারখানাটিতে দৈনিক গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার ন্যাপকিন উৎপাদিত হয়। ১০টি ন্যাপকিনসমৃদ্ধ একটি প্যাকেটের উৎপাদন খরচ পড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, যা খুচরা বিক্রেতার কাছে ৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়। বাজারে ভোক্তারা এটি পাচ্ছেন মাত্র ৭০ থেকে ৮০ টাকায়, যেখানে অন্যান্য ব্র্যান্ডের সাত পিসের প্যাকেটের দাম প্রায় ১০০ টাকা। গুণগত মান ও সাশ্রয়ী দামের কারণে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজারে এ ন্যাপকিনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের পথ
একজন নারী হয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো পণ্য নিয়ে বাজারে নামাটা সহজ ছিল না খুশির জন্য। শুরুর অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে খাদিজা পারভীন বলেন, ‘শুরুর দিকে অনেকেই টিটকারি করত, সামাজিকভাবে বুলিংয়ের শিকার হয়েছি। পুরুষ কর্মী না থাকায় আমাকেই মার্কেটিংয়ে নামতে হয়েছে। প্রতিযোগীরা বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি দিয়েছে, রাস্তায় আমাদের কর্মীদের গাড়ি চাপা দেওয়ার ভয়ও দেখিয়েছে। তবুও আমি থামিনি। আমার সহকর্মী নারীরা আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, কেবল নারীকর্মী দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় অনেক সময় বিপণন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হয়। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর থেকে ঋণ পেতেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মিলছে না সরকারি অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণ। আধুনিক মেশিন কেনা হলেও অর্থের অভাবে এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতিতে তা পুরোদমে চালু করা যাচ্ছে না।

স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ
শত বাধা সত্ত্বেও এ কারখানা এখন ১২৪টি পরিবারের অন্ন সংস্থানের উৎস। কর্মীরা রোস্টার ভিত্তিতে কাজ করে মাসে ছয় থেকে আট হাজার টাকা আয় করেন। শুরুর দিকের ২০ জন শেয়ারহোল্ডার লভ্যাংশ হিসেবে পান কারখানার মোট আয়ের ৩০ শতাংশ। কারখানার কর্মী বিজলী বেগম বলেন, ‘স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চলত না। এখানে কাজ করে মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় করি। টাকা জমিয়ে স্বামীকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনে দিয়েছি।’ আরেক কর্মী হাসিনা বেগম জানান, স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর গত ছয় বছর ধরে এ কারখানার আয়েই তিনি মা-বাবার সংসার চালাচ্ছেন।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের পাশাপাশি খুশি এখন স্থানীয় হস্তশিল্প, বুটিক ও কুটিরশিল্পের পণ্যও তৈরি করছেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে খাদিজা পারভীন খুশি তাঁর এ উদ্যোগকে আরও বহুদূর নিয়ে যেতে চান। 

আরও পড়ুন

×